You are here: Home / ফিচার / বিনা পয়সার প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ার

বিনা পয়সার প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ার

গাছ মানুষের প্রকৃত বন্ধু, এটা যেমন সত্যি ঠিক তেমনই সত্যি হল গাছই একমাত্র প্রাণী যা আমাদেরকে শুধু দিয়েই যায় বিনিময়ে কিছু চায়না। ইনডোর প্লান্ট সাধারণত গৃহ সজ্জার কাজেই ব্যাবহার করা হয়, কিন্তু আজ আমরা ইনডোর প্লান্টের এমন একটি গুণ এর কথা জানবো যা আমরা অনেকেই জানি না।

মহাকাশ গবেষণার জন্য প্রসিদ্ধ আমেরিকান সংস্থা নাসা (NASA),  তাদের মহাকাশ গবেষণার কথা সবাই জানে। এই সংস্থাটি মহাকাশ গবেষণার সাথে সাথে আরও অনেক বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে থাকে, সে সব গবেষণার খবর অনেকেই জানেন না। আশির দশকে নাসা তাদের মহাকাশ স্টেশন গুলোতে বাতাস (Air) পরিষ্কার করার জন্য প্রাকৃতিক একটি উপায় ব্যাবহার করে সুফল পায়। যার ফলে ঐ সব স্টেশনে বিশুদ্ধ বাতাস সরবরাহ করাটা অনেক সহজ এবং সুলভ হয়ে যায়।

নাসা যে প্রাকৃতিক উপায় ব্যাবহার করে তা আর কিছু নয় আমাদের অতি পরিচিত ইনডোর প্লান্ট। নাসার গবেষকবৃন্দ বিভিন্ন প্রজাতির ইনডোর প্লান্টের উপর গবেষণা করে শীর্ষ দশটি ইনডোর প্লান্ট নির্বাচন করেন যাদের বাতাসের ক্ষতিকর উপাদান শুষে নেয়ার ক্ষমতা আছে। এই গাছগুলিই পরবর্তীতে বাসা বা অফিসের বাতাস বিশুদ্ধ করার কাজে ব্যাবহার হয়ে আসছে। গাছের ব্যাবহারের কারনে সামান্য পানি এবং মাঝে সাঝে কীটনাশক ছিটানো ছাড়া আর কোন খরচ করতে হয়না, তাই আধুনিক অফিস ও বাসা বাড়ীতে এর বহুল প্রচলন আছে।

বাতাস পরিষ্কার করার দরকার কি?

আজকালকার শহুরে বসত বাড়ীতে আলো হাওয়া আসা যাওয়ার তেমন একটা সুব্যাবস্থা নেই। বদ্ধ ও গুমোট অবস্থার কারনে বাসা বাড়ি এবং অফিসগুলোর বাতাস ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে যায়। তাছাড়া মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতন ক্ষুদ্র ধূলিকণা বাতাসে ভেসে ঢুকে পড়ে বাসা বাড়ি এবং শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত অফিসগুলোতে, কিন্তু বের হবার পথ না থাকায় দিনের পর দিন ওখানেই জমে থাকে এবং ফাঁক বুঝে ঢুকে পড়ে আমাদের শরীরে।

অতএব খালি চোখে দেখা না গেলেও, বাতাস যে খুব একটা পরিষ্কার নেই তা বুঝতে কোন জ্যোতিষ হবার প্রয়োজন নেই। তাই সময় থাকতে নিয়ে আসুন ইনডোর প্লান্ট এয়ার পিউরিফায়ার আর শ্বাস নিন বিশুদ্ধ বাতাসে। আপনিও উপকৃত হন, আপনার সন্তানকেও সুযোগ দিন বিশুদ্ধ বাতাসে বেড়ে উঠার ।

চলুন দেখে নেয়া যাক এত উচ্চ ক্ষমতার ইনডোর প্লান্টগুলির পরিচিতি।

ইংলিশ আইভি (English Ivy)

প্রাকৃতিক

লতা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, খুবই দ্রুতবর্ধনশীল এই গাছ বাতাসের ক্ষতিকর উপাদান সমুহ পরিস্কারে খুবই কার্যকর। নাসা এই উদ্ভিদকে তাদের গবেষণায় এটিকে সবচাইতে কার্যকর প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ার উদ্ভিদ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। আমাদের দেশে এটি খুব একটি প্রচলিত উদ্ভিদ নয়, তবে এটি আমাদের আবহাওয়ায় হবার উপযোগী।

ইংলিশ আইভি কিন্তু বিষাক্ত, তাই একে সাবধানতার সাথে ব্যাবহার করা উচিৎ। এর পাতা পেটে গেলে সমস্যা হতে পারে। শিশুদের ও গৃহপালিত পশুর যেমন বিড়াল, খরগোশ ইত্যাদির নাগালের বাহিরে রাখাটাই ভালো।

স্পাইডার  প্লান্ট (মাকড়সা গাছ)

প্রাকৃতিকবহুল প্রচলিত এই গাছটি ইনডোর প্লান্ট হিসাবেই বেশী পরিচিত। চারিদিকে জালের মতো ছড়িয়ে যায় বলে, অনেকে একে মাকড়সা গাছ বলে। বৈজ্ঞানিক নাম “Chlorophytum comosum”, খুবই দ্রুত বর্ধনশীল বিধায় অতি অল্প সময়ে অনেক বাড়ে।

ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যবহৃত এই গাছটি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধিই করে না, ঘরের বাতাসকেও করে তোলে নির্মল ও নির্বিষ। ফরমালডিহাইড দূষণ থেকে সুরক্ষায় এটি অতুলনীয়, মাত্র ১০ থেকে ১৫ টি স্পাইডার প্লান্ট যে কোন সাধারন বাসার সুরক্ষায় যথেষ্ট।

ডেভিলস আইভি (Devil’s Ivy)

ডেভিলস আইভি বা শয়তানের আইভি নামে পরিচিত এই ইনডোর প্লান্টটিকে আমরা সবাই চিনি। বহুল প্রচলিত এই গাছটি আমাদের দেশে মানি প্লান্টপ্রাকৃতিক নামে পরিচিত, ডেভিলস আইভি ছাড়াও এর আরও অসংখ্য নাম আছে। নাম যাই থাক, গাছটি সেই মানি প্নান্টই; এই গাছটি অবহেলায় অযত্নে বেড়ে উঠতে পারে বলে অনেকদিন পর্যন্ত এর কদর ছিলোনা। নাসার গবেষণা এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে, নাসার গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে যে এই গাছটি ব্যাপক মাত্রায় বায়ু পরিশোধনে সক্ষম।

পৃথিবীর অনেক দেশে এমনকি আমাদের দেশেও একে ধন সম্পদের উৎস মনে করা হয়। প্রচলিত আছে, যে বাড়ীতে এই গাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকে সেই ঘরে প্রচুর অর্থ সমাগম হয়। তাইত এর নাম মানি প্লান্ট, কিন্তু পৃথিবীর অন্য অনেক দেশে একে দুর্ভাগ্যের কারণও মনে করা হয়। গল্প যাই হোক, এই গাছ ঘরের বাতাস পরিশোধনে অনেক কার্যকরী।

 

পিস লিলি (Peace Lily)

শান্তি কমল, কি সুন্দর নাম, শুনলেই কেমন যেন প্রশান্তির ভাব হয়। নাম যেমন সুন্দর, কাজেও তেমনই পটু এই শান্ত শিষ্ট গাছটি বায়ু পরিশোধনে ভীষণ কার্যকর। বৈজ্ঞানিক নাম “Spathiphyllum”, ইদানীং আমাদের দেশেও পিস লিলি প্রায়ই দেখা যায়, যদিও ইনডোর প্লান্ট হিসাবে নয় বাগানের শোভা বর্ধনেই এর ব্যাবহার বেশী হয়।

পিস লিলির ভি ও সি (VOC) অপসারন ক্ষমতা অনেক বেশী, তিন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল যেমন ফরমালডিহাইড(Formaldehyde), বেনিজিন (Benzene) ও ট্রাইক্লোরো এথিলিন (Trichloroethylene) এর বিরুদ্ধে বিশেষ কার্যকর।

প্রাকৃতিক

চায়নিজ এভারগ্রিন (Chinese Evergreen)

কমন একটি ইনডোর প্লান্ট চায়নিজ এভারগ্রিন। এটিও বাতাসের ক্ষতিকর উপাদান পরিশোধনে খুবই কার্যকর এবং শক্তিশালী, খুবই অল্প পরিচর্যায় এটি বেড়ে উঠতে পারে বলে ইনডোর প্লান্ট হিসাবে এর খ্যাতি দুনিয়াজোড়া।

পারটিকেল বোর্ড থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর কেমিক্যাল অপসারনে এটি তুলনাহীন। ভীষণ কষ্ট সহিষ্ণু এই গাছটি সত্যিই প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়।

প্রাকৃতিক

চায়নিজ এভারগ্রিন

ব্যাম্বু প্লাম (Bamboo Palm)

ব্যাম্বু প্লাম নামে পরিচিত এই গাছটি রীড প্লাম নামেও কোথাও কোথাও পরিচিত। এর বেনিজিন (Benzene) ও ট্রাইক্লোরো এথিলিন (Trichloroethylene) অপসারন ক্ষমতা অনেক, আর তাইতো খোদ নাসার লিস্টে এই গাছটি প্রথম দিকে স্থান করে নিয়েছে।

ইনডোর প্লান্ট হিসাবে এই গাছটি বেশ চমৎকার, ছায়া যুক্ত স্থানে এর বেড়ে উঠতে হয় না বলে এরা প্রথম থেকেই বাস বাড়ীর সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে আসছে। নাসা শুধু এর ব্যাবহারবিধিতে নতুন করে একটি পালক যুক্ত করেছে।

স্নেক প্লান্ট (Snake Plant)

সাপ গাছ, নামটাই যেন কেমন; কিন্তু নাম যাই হোক দারুণ কাজের গাছ। এই গাছ ফরমালডিহাইডের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। বিশেষ করে বাথরুম বা গোসলখানায় দারুণ কাজ করে, আর বাথরুমের পরিবেশ করে তোলে সহনশীল।

এই গাছ অল্প আলো আর অনেক বেশী জলীয়বাষ্পে আরামসে বেড়ে উঠতে পারে, বাথরুমের গরম আর গুমোট পরিবেশেও দাপটের সাথে বাঁচতে পারে। শুষে নিতে পারে সাবান, শ্যাম্পু আর টিস্যু পেপার থেকে প্রতিনিয়ত নিঃসৃত ক্ষতিকর বিষাক্ত কেমিক্যাল।

হার্ট লিফ ফিলোডেনড্রন (Heart Leaf philodendron)

নামে যতই খট মট লাগুক গাছটি কিন্তু তেমন একটা অপরিচিত না। মানি প্লান্ট জাতীয় গাছটি আজকাল আমাদের দেশেও বেশ প্রচলিত। লতানো প্রকৃতির এই গাছটি অনেকের বাসার বারান্দায় আজকাল শোভা বর্ধন করে থাকে। কেউ কেউ আবার একে বসার ঘরে শোভা বাড়ানোর কাজেও ব্যাবহার করে থাকেন।

প্রাকৃতিক

হার্ট লিফ ফিলডেনড্রন

এই গাছটি কিছুটা বিষাক্ত, বিশেষ করে এর পাতা খেলে অথবা কোনও ভাবে পেটে গেলে অসুস্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তাই একে বাচ্চাদের এবং বাসার গৃহপালিত পশুদের নাগালের বাইরে রাখাটাই উত্তম।

বামন খেজুর প্লাম (Dwarf Date Palm)

এটি পিগমি ডেট প্লাম নামেও সমান পরিচিত, এর বামুনে আকারেরে কারনেই এর এমন নাম হয়েছে। এই গাছটি ইনডোর প্লান্ট হিসাবে সবচেয়ে বেশী সমাদৃত, অনেক দিন বাঁচে বলে এর কদর অনেক বেশী। ভীষণ শক্ত এই গাছটি নাসার শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু নিয়মিত পানি আর বেঁচে থাকার মতো সামান্য আলো পেলে এরা বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে।

এই বামুন খেজুর প্লাম কিন্তু বায়ু পরিশোধনে অনেক কার্যকর, তাইতে বৃক্ষ প্রেমিদের প্রথম পছন্দ এই গাছটি। ঘরের চেহারাই পালটে দিতে পারে বলে একে সহজেই ডেকোরেশন পিস হিসাবে ব্যাবহার করা যায়।

বোস্টন ফার্ন (Boston Fern)

নামে বোস্টন ফার্ন হলেও এটি কিন্তু আমাদের অতি পরিচিত ফার্ন গাছই। আমাদের দেশে বহুল পরিচিত এই গাছটি নাসার শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে অনায়াসে। উচ্চ বায়ু পরিশোধন ক্ষমতার কারনে এই গাছটি ইনডোর প্লান্ট হিসাবে খুবই ভালো।

প্রাকৃতিক

বোস্টন ফার্ন

 

এর সৌন্দর্য বর্ধন ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার কোন উপায় নেই, ছবিতে দেখুন কেমন করে বোস্টন ফার্ন আপনার বাগান এবং ঘরেরে সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

হাজার হাজার টাকা দিয়ে ডিহিউমিডিফায়ার না কিনে এই গাছগুলি ব্যাবহার করেই ঘরের বাতাস শুদ্ধ করে তুলতে পারেন। টাকাও বাঁচবে আবার বিদ্যুৎ ও সাশ্রয় হবে। এয়ার পিউরিফায়ার গাছগুলি খুব একটা দামী গাছ না, এর এক একটি চারার দাম ৫০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যেই হবার কথা, তাহলে আর দেরি কেন, আজকেই নিয়ে আসুন প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ার আর উপভোগ করুন পরিশুদ্ধ নির্মল বাতাস। মনে রাখবেন প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ারের নাসা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র পরিবেশক সৌখিন, আমাদের কোথাও কোন শাখা নেই। আজ এই পর্যন্তই, আবার দেখা হবে।

Leave a Reply

Scroll To Top