You are here: Home / পেট / কবুতরের টিকা বা ভ্যাকসিন

কবুতরের টিকা বা ভ্যাকসিন

একজন নতুন পালক হিসাবে যখন কবুতর পালা শুরু করেন তখন তাঁর মনে কবুতর পালা সম্পর্কে একটা নেগেটিভ ধারনা দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সেই কবুতর পালক প্রথম থেকেই একটা নার্ভাস অবস্থার মধ্যে দিন পাত করে। ফলে সামান্য কিছু হলেই ভয় ও আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে ফেলে, তখন তিনি বিভিন্ন জনের কাছে পরামর্শের জন্য ছুটে যান। আর পরামর্শ দাতা জানুক আর নাই জানুক তাকে একটা পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। সেই নতুন কবুতর পালক নিজের অজান্তেই দিন কয়েক এর মধ্যে মোটামুটি সব ধরনের ঔষধের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেলেন। যদি কবুতরের ভাগ্য ভাল থাকে, আর তাঁর জীবন লাইন যদি দীর্ঘ হয় তাহলে হয়ত সেই যাত্রায় বেঁচে যেতে পারে। আর যদি কবুতরটি মারা যায় তখন মনকে সান্তনা দেন যে তাঁর হায়াত ছিল না। এটাই হল আমাদের সাধারন চিত্র। আর এই চিত্রের সূত্রপাত হয় ভ্যাকসিন দিয়ে। তাই অধিকাংশ কবুতর পালকের প্রথম কয়েকটি সাধারন যে প্রশ্ন থাকে, তাঁর কয়েকটি হল। হ্যা এটি অবশ্যই কবুতরের টিকা প্রসঙ্গে-

(Pigeon Vaccine)কবুতরের টিকা

১) কোন ভ্যাকসিন দিব? ২) কয় মাস পরপর দিব? ৩) কিভাবে দিব? ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর যতক্ষণ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত ভ্যাকসিন না দেন ততক্ষণ পর্যন্ত,সেই খামারি মানসিকভাবে প্রশান্তি লাভ করেন না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ভ্যাকসিন সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব কম লোকেরই সঠিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আছে। অনেকেরই ধারনা যে ভ্যাকসিনই সকল সমস্যার সমাধান। ভ্যাকসিন না দিলে কবুতর মারা যাবে, ভ্যাকসিন না দিলে কবুতর টাল হয়ে যাবে………। এরকম নানা ধরনের কল্প কাহিনীও ধারনা নিয়ে অধিকাংশ খামারি কবুতর পালন করেন। আমি যদিওএর আগে (PMV,PPMV,PMV1(New Castle) নিয়ে পোষ্ট দেওয়া হয়েছিল। তারপরও ভ্যাকসিন সম্পর্কে আরও ভাল ধারনা দেবার লক্ষে আমার আজকের এই ছোট প্রয়াস। আশাকরি এই পোষ্ট পড়ে খামারিরা কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। আর তাহলেই আমার লিখাটা সার্থকতা লাভ করবে। এখন আসুন আমারা জেনে নেই ভ্যাকসিন কি? এর উপকারিতা কি? কি ধরনের ভ্যাকসিন দেয়া উচিৎ? কখন ভ্যাকসিন দেয়া যায়…? ইত্যাদি

 

ভ্যাকসিন এর সংজ্ঞাঃ
নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধের জন্য ব্যাবহ্রিত এক ধরনের বিশেষ টিকা। যা সেই রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু থেকে তৈরি করা হয়। সেই নির্দিষ্ট রোগের প্রতিরোধক হিসাবে। অসুস্থতা, অক্ষমতা, এবং মৃত্যু সৃষ্টিকারী অনেক রোগ এখন টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। ভ্যাকসিন বা টিকা অ্যান্টিবডি তৈরিতে সহায়তা করে ও তথাকথিত সেলুলার ইমিউন সিস্টেম উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে।

ভ্যাকসিনের প্রকারঃ
ভ্যাকসিন সাধারণত ২ ধরনের ১) লাইভ ভ্যাকসিন ও ২) কিলড ভ্যাকসিন।

কবুতরের টিকা বা ভ্যাকসিন
১) লাইভ ভ্যাকসিনঃ
একটি ক্ষয়িত টীকা বা প্যাথোজেন যার তীব্রতা হ্রাস করে তৈরি একটা টীকা। যা দুর্বল সংক্রামক এজেন্টকে নির্মূল করতে কাজ করে যা নির্দোষ বা কম উৎকট হয়ে পরিবর্তিত হয়। ভাইরাস “হত্যা” দ্বারা এই টিকা উত্পাদিত হয়।

এই টিকা স্বল্প সময়ের জন্য দেয়া হয় ও শরীরের বাইরে প্রয়োগ করা হয়।

কবুতরের টিকা বা ভ্যাকসিন

২) কিলড ভ্যাকসিনঃ
অক্রিয়াশীল বা কিছু উপায়ে হত্যা করা হয়েছে এমন একটি সংক্রামক এজেন্ট থেকে তৈরি একটা টীকা।
এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য দেয়া হয় ও শরীরের ভিতরে প্রয়োগ করা হয়।

কবুতরের টিকা বা ভ্যাকসিন

সতর্কতাঃ
১) লাইভ ভ্যাকসিন প্রয়োগের ব্যাপারে নির্দিষ্ট ও খুব সতর্কতা পালন করতে হয়। যেমনঃ মাস্ক,গ্লাভস পরিধান করা ও খেয়াল রাখতে হয় যেন ভ্যাকসিন মাটিতে না পড়ে বা অবশিষ্ট বা বেচে যাওয়া ভ্যাকসিন পুতে ফেলতে হয়।

২) সুস্থ প্রদর্শিত সমস্ত পায়রা ভ্যাকসিন করা যেতে পারে।
৩) চিকিত্সাগত ভাবে অসুস্থ এবং নির্বল পায়রা ভ্যাকসিন করা যাবেনা।
৪) ডিম পাড়বে এমন কবুতরকে ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া যাবেনা।
৫) ভ্যাকসিন এর সাথে দেয়া ঔষধ ছাড়া বাইরের অন্য কোন ভ্যাকসিন এর ঔষধ মিক্সআপ করা যাবেনা।
৬) ভ্যাকসিন দোকান/পরিবহন কালে বা ফ্রিজে (২°সেঃথেকে৪° সেঃ) এর তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। বরফে পরিণত করবেন না। আলো থেকে রক্ষা করতে হবে মানে সূর্যের আলো যেন না পড়ে।
৭) লেবেল ছাড়া কোন ভ্যাকসিন দিবেন না, আর মেয়াদ দেখে নিবেন।
৮) কৃমির ঔষধ ও ভ্যাকসিন কাছাকাছি সময়ের ব্যাবধানে দেয়া যাবে না।
৯) স্বল্প সময়ের ব্যাবধানে অন্য ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না।

কবুতরের টিকা বা ভ্যাকসিন

ভ্যাকসিন বা টিকার জন্য উপযুক্ত সময় নীচে দেওয়া হল:

১) স্টক প্রজনন জোড়ার মেটিং এর ৪-৬ সপ্তাহ আগে।
২) ইয়াং পায়রা নীড় মধ্যে ৪ দিন বয়সের আগে।
৩) রেসিং সিজন শুরু করার ৪-৬ সপ্তাহ আগে।
৪) প্রদর্শনী জন্য কবুতরকে ৪-৬ সপ্তাহ পূর্বে।

ভ্যাকসিন বা টিকা দিবার আগে করনীয়ঃ

কৃমির ঔষধ দিবার যে নিয়ম পালন করা হয়, ভ্যাকসিন এর ও ক্ষেত্রে অনেক একই নিয়ম অনুসরন করা ভাল। যেমনঃ

১) বেশি গরমে ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না।
২) ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার আগে সুষম খাদ্য দিতে হবে।
৩) লিভার টনিক দিতে হবে।
৪) সকালে বা রাতে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা ভাল।
৫) ভ্যাকসিন দিবার দিন স্যালাইন দিতে হবে। প্রয়োজনে চালের স্যালাইন দেয়া যেতে পারে।
৬) ভ্যাকসিন দিবার একদিন পর থেকে ৩ দিন মাল্টি ভিটামিন দিতে হবে।
৭) পায়ে বা পাখায় ভ্যাকসিন পুশ করা যাবে না।
৮) সব ধরনের ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে একই নিয়ম মেনে চলতে হবে।

ভ্যাকসিন করার নিয়মঃ কিলড ভ্যাকসিন পুশগান বা ইনসুলিন এর সিরিঞ্জ দিয়ে ভ্যাকসিন করতে হয়। পুচ্ছ থেকে ঘার অভিমুখে শিরদাঁড়ার শেষ প্রান্তে পায় রাপ্রতি 0.২ মিলি পরিমান ইনজেকশন পুশ করতে হয়। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যেন মাথার পিছনে না পুশ করা হয় বা হাড্ডিতে সূচনা লাগে। এতে কবুতর প্যারালাইস হবার সম্ভাবনা থাকে। লাইভ ভ্যাকসিন সাধারণত ১ চোখে বা ১ নাকে ১ ফোঁটা করে দিতে হয়। সবক্ষেত্রেই সবগুলো ঔষধ এক সঙ্গে মিক্স করতে হয়। ভ্যাকসিন ভায়াল খোলার পর ২ ঘণ্টা সময় পর্যন্ত ব্যাবহারের জন্য উপযুক্ত থাকে।

ভ্যাকসিন ইমিউনিটি স্থিতিকাল বা সময়: কিলড ভ্যাকসিন ১২ মাস। লাইভ ভ্যাকসিন ৩০-৪৫ দিনপরপর।

আমাদের দেশে ব্যাপক ভাবে কবুতরের কোন ভ্যাকসিন আমদানি করা হয় না। যেগুলো সহজলভ্য। সেগুলো সবই হাঁস বা মুরগির (পলট্রি এর জন্য প্রযোজ্য)। এগুলো কততুকু কাজে আসে সেগুলো নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু তবুও একবিচিত্র কারনে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বা এক্সপার্ট হিসাবে দাবীকৃত কিছু লোক সকল কবুতর খামারিকে এই ধরনের ভ্যাকসিন ব্যাবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, যেভাবে তারা এটার ব্যাবহার এর পরামর্শ দেন সেটাও সম্পূর্ণরূপে ভুল আর ভুল। এমনকি তারা এই সব কোম্পানির লিখা নির্দেশও ঠিকমত পালন করতে বলেন না। ফলে ভ্যাকসিন এর উপকারিতা থেকে অপকারিতাই বেশি হয়। যেসকল কাজের ভ্যাকসিন আছে। সেগুলো ব্যাক্তিগত উদ্যোগে আনা হয়। যা কিনা সাধারন মানুষ কিনতে গেলে, গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে এর দাম শুনে। এই সব স্বার্থান্বেষী ব্যাবসায়ি বেশি মুনাফার আশায় বাংলাদেশের বাইরে থেকে এই ধরনের ভ্যাকসিন নিয়ে আসে ও ১০ গুনদামে বিক্রি করে থাকেন। আমাদের দেশে কবুতরের অবকাঠামো উন্নয়ন এর জন্য এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, দু একটা ছাড়া। যায় হোক আমার বাক্তিগত পরামর্শ সকল কবুতর খামারিদের যদি ভ্যাকসিন সত্যিই করতে চান। তাহলে উন্নতমানের ভ্যাকসিন ব্যাবহার করুন আর তা না হলে ভ্যাকসিন দেয়া থেকে বিরত থাকুন। কারন যদি সত্যিসত্যি পারামক্সি ভাইরাস দ্বারা আপনার খামার আক্রান্ত আপনি কিছু বুঝার আগেই আপনার পুরো খামার সাফ হয়ে যাবে , তা এই so called ভ্যাকসিন দেয়া থাকুক আর নাই থাকুক এতে কোন কাজে আসবে না । অনেকে বলে থাকেন ভ্যাকসিন ৬ মাস দিলেই হয়। কিন্তু এই সব লোক আসলে ভুলের রাজ্যে বাস করে। আপনি যদি ভ্যাকসিন দেয়া শুরু করেন তাহলে অবশ্যই সারা বছর ভ্যাকসিন দেয়া উচিৎ । আর তা না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাঁর দায়দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। সেইসব উপদেশ কারীকে তখন আপনার পাশে পাবেন না। তবে আপনি যদি ৩ টি কাজ ঠিকমত করে থাকেন তা হলে আপনাকে আপনার খামার নিয়ে চিন্তিত থাকতে হবে না।

১) খামারপরিস্কার রাখা।
২) সাল্মিনিল্লা কোর্স করা।
৩) কৃমির ঔষধ প্রয়োগ করা।
এখন আসুন আমরা জেনেনি কি ধরনের ভ্যাকসিন আপনি ব্যাবহার করলে সত্তিকারের উপকৃত হবেন। একটা কথা খেয়াল রাখবেন, প্যারামক্সি ভ্যাকসিন ছাড়া অন্য যেসকল ভ্যাকসিন আছে সেগুলোর ব্যাবহারিক কার্যকারিতা খুব একটা নাই।

কি ধরনের ভ্যাকসিন বা টিকা কবুতরের জন্য উপযুক্তঃ
১) chevivac-P200 Vaccine ২) Colombovac PMV Vaccine ৩) Avian PMV vaccine

আপনি আপনার কবুতরের একমাত্র অভিভাবক আর তাই আপনার কবুতরের ভালমন্দ আপনাকেই বুঝতে হবে। তাই নিজের বিবেক বুদ্ধি ব্যাবহার করবেন। কোনটা আপনার কবুতরের জন্য ভাল আর কোনটা না সেটা আপনি ছাড়া আর ভাল কেউ বুঝবেনা। কারন আপনার কবুতর যখন মারা যাবে বা কোন ক্ষতি হবে তখন অন্য সকলের আফসোস করা ছাড়া আর কোন কিছু করার থাকবে না। সফল হলে যেমন আপনার লাভ তেমনি অসফল হলেও আপনারই ক্ষতি। তাই বিচার বিবেচনা আপনারই হাতে।

 

লেখকঃ Kf Sohel Rabbi  ( কবুতর বিশেষজ্ঞ )

Leave a Reply

Scroll To Top