You are here: Home / পেট / সৌখিনদের সৌখিন কবুতর পালন

সৌখিনদের সৌখিন কবুতর পালন

কবুতর পালন
কবুতর একটা এমন একটা প্রানী যে, এটা মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা মঠ সব জায়গায় এর দেখা মিলে। বর্তমানে গ্রামের শতকরা ৬০ ভাগ ঘরেই কবুতর পালতে দেখা যায়। কবুতরের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ তা অন্য কিছুতেই নেই। এটা মানুষের নেশা, পেশা, শখ ও সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম হিসাবে আজ পরিচিত। কবুতর প্রেমিদের সেই নেশা ,পেশা ও ভালো লাগার আরো একধাপ এগিয়ে নিয়েছে সৌখিন কবুতর (fancy pigeon), এই সৌখিন কবুতর যে কত সুন্দর হতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আজ স্কুলের একজন ছাত্র থেকে শুরু করে অফিস আদালতের কর্মরত, সেনাবাহিনী, জর্জ, উকিল, পুলিশ কমিশনার এর মত সব উচ্চপদের মানুষ আজ এই কবুতর পালন কে নিয়েছে শখ কিংবা নেশা হিসেবে । এভাবেই কবুতর পালন আজ সবারই ভালো লাগা ও ভালবাসার প্রানীতে পরিনত হয়েছে। আজ সৌখিন কবুতর (fancy pigeon) পালন শুধু শখ বা নেশা নয় এটা আজ অনেক বড় পেশাতেও পরিণত হয়েছে। আজকাল অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকরা এই পেশায় নিজেদের কাজে লাগাচ্ছে। এই পেশায় সময় দিয়ে অনেক যুবকরা তাদের বাইরের আড্ডা, বা খারাপ সঙ্গ থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারছে। একজন কবুতর খামারি নিজেও বলতে পারবে না যে, তাকে খামারে সময় দিতে গিয়ে দিনটা কিভাবে কেটে যায়। অনেক সময় হয়তো ভেবেই পাওয়া যায় না যে দিনটা এত তাড়াতাড়ি কিভাবে কাটল, আজ দিনটা কি ছোট নাকি ? অনেকে আবেগের তাড়নায় বলে ফেলেন যে, বন্দি বা খাচায় পাখি বা কবুতর পালা উচিৎ না। আর এটা ইসলামে এটা নিষেধ। আসলে এটা একেবারেই ভিত্তিহীন কথা, যারা এধরণের কথা বলেন তারা না জেনেই বলে থাকেন। আর না জেনে কথা বলাটা মারাত্মক পাপ।

রসূল (সঃ) বলেন, “একজন মুসলিম যিনি একটি পোষা প্রাণী রাখতে পছন্দ করে, তার দায়িত্ব হল ভালমত এর যত্ন নেয়া, যথাযথ খাদ্য, পানি এবং আশ্রয়ের ব্যাপারে খেয়াল করা। কোন ব্যাক্তি যদি একটি পোষা প্রাণীর যত্নের ব্যাপারে উদাসীন বা উপেক্ষিত হয় তার কঠিন শাস্তি বর্ণনা করেছেন।“

সুতরাং কেউ যদি সত্যি সত্যি পাখি, প্রানি বা কবুতর পালতে চান তাহলে তাদের অবশ্যই এসব শর্ত মানতে হবে। যাই হোক যারা আগে থেকেই সৌখিন কবুতর পালেন তাদের ও যারা পালতে চান তারা আজ এই পোষ্টটি পড়ে কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন বলে আশা রাখি।
আপনি কিভাবে একটি ভালো খামার গঠন করবেন?

১) জায়গা নির্বাচনঃ
খামারের জায়গা এমন হওয়া উচিৎ, যেখানে পর্যাপ্ত আলো বাতাস ও রোদ আসে। অর্থাৎ গরমের সময় বাতাস ও শীতের সময় রোদ দুটোই পাওয়া যায়। গ্রামে যারা থাকেন তাদের এমন ধরণের জায়গা নির্বাচন নিয়ে তেমন বেগ পেতে হয় না। কিন্তু যারা শহরে থাকেন, বিশেষ করে সেটা যদি ভাড়া বাসা হয় তাহলে, তা হয় এক মহা বিপদের মত। আপনি আপনি যদি বাড়ির মালিক হন তাহলে আপনার ছাদে ঘর বানিয়ে, খামার তৈরি করতে পারেন। আর যদি ভাড়া থাকেন, তাহলে মালিকের অনুমতি নিয়ে, একটা ঘর বা বারান্দায় খামারের ব্যাবস্থা করতে পারেন।

২) কিভাবে পালবেনঃ
সৌখিন কবুতর দুই ভাবে পালা যায়, ক) ছাড়া অবস্থায় (কলোনি) ও খ) খাঁচার মধ্যে।
ছাড়া (কলোনি) অবস্থায় পালতে চাইলে খেয়াল রাখতে হবে যেন মিস ক্রস না হয়, তাহলে জাত নষ্ট হবার ভয় থাকে। তাই আমি খাঁচায় পালন করাটাই বেশি অগ্রাধিকার দিই।

৩) খাচার মাপ/আকার/সাইজঃ
খাঁচার আকার বা সাইজ কি হবে তা নির্ভর করে আপনি কি ধরণের কবুতর পালতে চাচ্ছেন তার উপর। যদি আপনি শুধু গিরিবাজ পালতে চান তাহলে। ১৪*১৪*১৬ ইঞ্চি হলে ভালো। আর যদি সৌখিন কবুতর পালতে চান তাহলে সাধারণত আদর্শ মাপ হল ২৪*২৪*১৮ ইঞ্চি আর ২৪*২৪*২০ ইঞ্চি হলে আরো ভালো। তবে খামারে পালন করতে গেলে সব খাঁচা একই মাপের হলে ভালো হয়। এতে খামারের জায়গার ব্যাবস্থাপনা করাটা ভালো হয়।

৪) খাঁচা কোথায় পাবেন বা বানাবেন আর এর দামঃ
বাজারে বা এলাকায় তৈরি খাঁচা পাওয়া যায়। কিন্তু যা ৪০০-১২০০ টাকার মধ্যে, তবে এসব খাঁচার মান তেমন ভালো থাকে না। তাই অর্ডারি খাঁচা বা নির্দেশ মোতাবেক খাঁচা বানানো ভালো, যদিও দামের পার্থক্য খুব বেশি হয় না। কিন্তু ভালো মানের জিনিস পাওয়া যায়। যার রিসেল মূল্য ভালো হবে। ঢাকার নিমতলি পশু হাসপাতাল এর অপরপাশে এই ধরনের খাচার অনেক দোকান আছে যারা সুলভে খাঁচা তৈরি করে থাকে। যার মূল্য ১১৫ টাকা/কেজি থেকে ১৩০ টাকা/কেজি। দেখে নিবেন যেন খাঁচার তার তা একটু মোটা ও জং ধরা না হয়। ট্রে টা একটু মোটা শিট দিয়ে তৈরি করবেন যাতে সেটা জং ধরার ভয় না থাকে। খাঁচার শিক গুলো অনেক সময় জং ধরা থাকে তাই খাঁচা আনার আগে রঙ করিয়ে নিলে আর ভালো হয়। আর অবশ্যই খাঁচা তৈরির পর ভালো করে দেখে নিবেন যেন কোনা গুলো ঠিক মত মেশিন দিয়ে ঘষা হয়েছে তা না হলে আপনার হাত ও কবুতরের পা কাটার ভয় থেকেই যাবে। খাঁচার ফাঁকটা(গ্যাপ) ৪*৪ ইঞ্ছি হয় বা এর কম বেশি করতে পারেন। এতে দুটি উপকার হবে এক আপনার খাঁচার খরচ কমে যাবে ও দুই খাবারের পাত্র খাঁচার বাইরে লাগানো যাবে। কারণ খাঁচার ভিতরে খাবারের পাত্র থাকলে কবুতর পানি ও খাবারের পাত্রে পায়খানা করতে পারে বা খাবার নষ্ট করার প্রবনতা তৈরি হতে পারে। যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তারা খাঁচা আলাদা ভাবে তৈরী করলে ভালো এতে বাসা পরিবর্তনের সময় খাঁচা নিতে সুবিধা হবে। যদিও এতে একটু খরচ বাড়তে পারে। কিন্তু এতে আপনি বেশি উপকারিত হবেন। আর খাঁচা যখন পরিবহণ করবেন কবুতর সহ তখন অবশ্যই খাঁচা ঢেকে নিবেন। এতে কবুতরের ভয় পাবার বা স্ট্রেস হবার ভয় কম থাকে। আর যাদের নিজের বাড়ি তারা ৬ টা বা ৮ তার একটা সেট তৈরি করতে পারেন। তবে খাঁচার নিচের দিকে একটু বেশি গ্যাপ দেয়ার চেষ্টা করবেন এতে করে আপনার খাঁচার পরিচর্যা করতে সুবিধা হবে।

৫) খাবার ও পানির পাত্রঃ
খাবার ও পানির পাত্র টিনের না হয়ে প্লাস্টিক এর হলে ভাল হয় যাতে আপনি কিছুদিন পর পর ধুতে পারেন আর এটা জং ধরার ভয়ও থাকবে না। আর পাত্র গুলো একটু বড় ও গভীর হলে ভালো কারণ তাতে কবুতর খাবার গুলো নষ্ট করবে কম ও ফেলতেও পারবেন না। সবচেয়ে যেটা বেশি দরকার সেটা হল ঔষধ বা সাধারণ অসুস্থ কবুতর কে খাওয়ানোর জন্য নল লাগান syringe।

৬) ঔষধ ও ভিটামিন মজুতঃ
কথায় আছে ঘোড়া কেনার আগে লাগাম কেন গরু কেনার আগে দড়ি। তেমনি কবুতর পালনের আগেই আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও অ্যান্টিবায়টিক এর মজুত এর ব্যাপারে। যেমনঃ Doxivet, ESB30 (অ্যান্টিবায়টিক), Cosmix Plus, Electrolyte(saline), Biovit/Toxinil(ভিটামিন), Powermax Ws(মাল্টি ভিটামিন), Calcium Forte(ভিটামিন),Shafi,Febnil,Cinkara(tonic),Riboflabin,Flazil ইত্যাদি। এছাড়া হোমিও কিছু ঔষধ যেমনঃBelodona 30,Borax 30, Kali curb 30,Kali Hydro 30 ইত্যাদি জীবাণু নাশক ফার্ম ৩০, Timson,Virocid, Vircon S, Hexisol hand rub, Povisep,Detol,Antiseptic creme ঔষধ ও মজুত রাখলে ভাল। ঔষধ নিমতলি ভি-ফার্মাতে পাবেন।(মিঃইমরান সেল #০১৭১৭৯২০৭১৮) আপনি পার্সেল যোগেও ঔষধ নিতে পারবেন।

৭) প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিঃ
কিছু জিনিস যা আপনার হাতের কাছে রাখলে ভালো যেমনঃ কাচি, হ্যান্ড গ্লাভস(৯০ টাকা), মাস্ক, আলাদা স্যান্ডেল, হ্যান্ড স্প্রে( যার দাম পড়বে অটো ৩ লিটার ১৮০ টাকা, আর বড় অটো ২০ লিটার ৯০০ টাকা।) ছেনি (ময়লা বা পায়খানা পরিস্কার এর জন্য।), এছাড়াও ঔষধ ও ভিটামিন রাখার জন্য ছোট বড় রঙ্গিন বোতলে রাখলে ভালো হয়। এছাড়াও খাবার রাখার জন্য একটা ঢাকনা ওয়ালা বড় পাত্র ও পানির বড় ঢাকনা ওয়ালা পাত্র হলে ভালো হয়, আর পানি পরিবেশনের জন্য একটা জগ ও খাবার দিবার একটা ছোট বাটি বা হাতল ওয়ালা ছেনি। গোসল করানর জন্য একটা টিনের বা প্লাস্টিক বড় টব।

 

লেখাঃ কে এফ সোহেল রাব্বি ( কবুতর এক্সপার্ট)

Leave a Reply

Scroll To Top