You are here: Home / পেট / সৌখিনদের সৌখিন কবুতর পালন- পর্ব ২

সৌখিনদের সৌখিন কবুতর পালন- পর্ব ২

কবুতর পালন

৮) কি ধরনের বা জাতের কবুতর পালবেনঃ
কবুতর পালনের ৩টি স্তর আছে, যেমন –
ক) প্রথম স্তর/ পর্যায়ঃ
এই স্তরে একজন নতুন পালক নতুন ভাবে কবুতর অবস্থায় কবুতর পালন শুরু করেন। এই অবস্থাকে কঠিন অবস্থা বলা হয়। কারণ এই পর্যায়ে একজন নতুন খামারি বেশি ঠকে থাকেন। নতুন অবস্থায় যে কবুতর দেখা হয় সেটাই ভালো লাগে। আর তাই ফাটা বা বেজাতের, মিস ক্রস, যেমন ইচ্ছে তেমন কবুতর সংগ্রহ করে খামার ভরিয়ে তুলেন। যে কবুতরের দাম ৫০০ টাকা তা না জেনে বুঝে কেনেন ১০০০ টাকা দিয়ে এভাবে দুই গুন ৩ গুন দামে কবুতর কেনেন। আর কিছু অসাধু ব্যাবসায়ি ও খামারি এই সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকেন। এই লেভেল এর পালক অনেক সময় কম দাম দিয়ে এই স্তরের কবুতর কিনে অল্প কিছুদিন পর তার কেনা সব কবুতরই হারাতে বসেন। কারণ তিনি জেনে না জেনে যথাযথ জ্ঞানের অভাবে সাধারণ চিকিৎসা পর্যন্ত দিতে ব্যর্থ হন। ফলে সুস্থ কবুতর অসুস্থ হয় ও পরে অসুস্থ কবুতর মারা যায়। তাই এই স্তরের পালকদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, আগে কবুতর পালন শিখতে হবে। আর এর জন্য প্রথমে লাক্ষা,সিরাজি,হমার,এই ধরনের কবুতর পালন করে হাত জস/পাকাতে হবে। কারন সৌখিন কবুতর দেশি/গিরিবাজ কবুতরের মত না এগুলোর রোগবালাই একটু বেশিই হয়।

খ) দ্বিতীয় স্তর/ পর্যায়ঃ
এই পর্যায়ে একজন খামারি কিছুটা অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকে। আর তার ভুলের কারনে প্রথমে নিজের প্রতি ও পরে তাকে যারা ঠকিয়েছে তাদের প্রতি একটু বিরিক্ত বোধ করে। অনেকেই হতাশ হয়ে পালন ছেড়েই দেন। আর অনেকেই পুরান ভুল সুধরানোর জন্য, ফাটা বা বেজাতের কবুতর গুলোকে বিক্রি করেই হোক বা দান করেই হোক বা জবাই করেই হোক কবুতর পালনের ইতি ঘটান। অনেকেই আবার নতুন করে তৈরি করার পরিকল্পনা করে থাকে। এই পর্যায়ে এই স্তরের পালক রিং ও আমদানিকৃত কবুতরের প্রতি ঝুকে বেশি। যা তাকে আরেকটি ভুল পথে পা বাড়ায়। আর যেহেতু আগে অনেক দাম দিয়ে ফেলেছেন তাই এই স্তর/ পর্যায় এ কম দামে ভাল কবুতর কিনতে যান। ফলে দ্বিতীয় বারের মত ভুল করে বসেন। আর যেহেতু এই স্তরের খামারি রিং সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। আর এই সুযোগে সেই সকল ব্যাবসায়ি ও খামারি নিজের সরবরাহকৃত রিং, সেই অলিক রিং বলে চালিয়ে দেয়। আর আমদানিকৃত কবুতর কিনে ১ বছরেও ডিম না পেয়ে হতাশায় ডুবে যান। তখন খামার করবে না ছাড়বেন, এই ধরের দোটানায় থাকেন। আমার এই পর্যায়ের খামারির প্রতি অনুরোধ, রিং বা আমদানিকৃত কবুতরের পিছনে না ছুটে। দাম যাচাই করে ভালো মারকিং ও জাতের কবুতর সংগ্রহ করুন। এই স্তরের খামারি যেহেতু কিছুটা অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকে তাই তাদের একটু ভালো জাতের ও দামের কবুতর পালনে যেতে পারেন। যেমনঃ পটার, স্ত্রেসার,কিং,জ্যাকবিন, বিউটি হুমার, হলুদ লক্ষা, হেলমেট, নান ইত্যাদি।

গ) তৃতীয় স্তর/ পর্যায়ঃ
এই স্তর/ পর্যায় এর খামারি অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে, রোদে জলে থেকে, অনেক ঠক খেয়ে,অনেক ভালবাসার ও পছন্দের কবুতর হারিয়ে অবশেষে খাঁটি খামারি হয়ে যান। আর এই পর্যায়ের খামারি চিনতে শিখেন সেই সব কবুতর ব্যাবসায়ি ও ঠকবাজদের। আর চিনতে শিখেন কোনটা আসল রিং আর কোনটা নকল। কোনটা আমদানিকৃত আর কোনটা লোকাল। তিনি জানতে শিখেন আমদানিকৃত কবুতর কিনে কি করতে হবে। আর এই পর্যায়ের কবুতের পালক বা খামারিদের আমার কোন উপদেশ নেই কারণ, তারা যদি একটু নিজের বিচার বুদ্ধি খাটায় তাহলেই তারা একজন সফল খামারি হতে পারবেন। আপনি যে স্তরের খামারি হোন না কেন অল্প পালেন কিন্তু, ভাল জাতের কবুতর পালেন।

৯) ফসটার কবুতর তৈরিঃ
কিছু কবুতর আছে যারা নিজেদের ডিম বা বাচ্চা নিজেরাই করে আর, কিছু দামি কবুতর তারা এটা করতে পারে না। তাদের দেহের গঠন এর কারনেই হোক বা অন্য কারনেই হোক, এসব কবুতরের ডিম তা দিবার জন্য বা বাচ্চা তোলা ও বাচ্চা পালনের জন্য কিছু শক্ত সামর্থ্য কবুতর রাখতে হয় আর এটা করতে হয় এক জোড়ার জন্য দুই জোড়া ফসটার। যেমনঃ পটার, স্ত্রেসার, কিং, জ্যাকবিন ইত্যাদি। ডিম ফস্টারিং করলে ভাল এক্ষেত্রে, ডিম দিবার ও চালার তারিখ মনে রাখতে বা লিখে রাখতে হবে। আর এর পার্থক্য ২-৩ দিনের ব্যাবধানের বেশি যেন না হয়।

১০) কবুতরের খাবারঃ
কবুতরের খাবার একজন খামারির জন্য অন্যতম প্রধান উপাদান। একজন খামারি কি খাবার দিবেন বা একজন খামারি কিভাবে খাবার সংরক্ষণ করবেন তার উপর তার সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে থাকে। কারণ কবুতরের অধিকাংশ রোগ ও ব্রিডিং ক্ষমতা এই খাবারের উপরেই নির্ভর করে। তাই একজন খামারি শুধু গম বা ধান দিয়ে তার দায়িত্ব সারতে পারবে না। অনেকেই আছেন যে ব্যাবসার চিন্তা মাথায় থাকে বলে, খাবারের পিছনে বেশি খরচ করতে চান না। যাতে তার ব্যাবসার ক্ষতি না হয়।কিন্তু ব্রিডিং কম ও ডিম না ফুটা বা বাচ্চা ভাল মত না হবার কারনে যে তার কত ক্ষতি হচ্ছে তিনি সেটা মনে রাখেন না। আপনি আপনার কবুতর কে কি ধরনের খাবার দিবেন তা খাবারের পোস্ট এ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে একটু দেখে নিবেন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন অলসতা করে বা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে সাধারন মিক্স খাবার বেশি দামে কিনবেন না। আপনার খাবার আপনি নিজেই কিনুন। এতে আপনার খরচ বাচবে ও অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় হবে। আর খাবার কখন দিবেন কিভাবে দিবেন এটা আপনার উপর নির্ভর করে। তবে খাবার দিনে ২ বার দিবেন ও তুলে নিবেন পানি যেন সব সময় থাকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন। আর পানি যদি নষ্ট করে তাহলে তাড়াতাড়ি পরিবত্তন করে ফেলবেন। তবে যে কবুতর ডিম পেড়েছে, বা বাচ্চা আছে, বা তাদের খাবার সব সময় রাখা ভাল এতে বাচ্চার আকার বড় হয়। আর এই অবস্থায় গ্রিট এর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর খাবারের ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন যেন ডাবলির পরিমান বেশি থাকে কারন এটা কবুতরের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর খাবার।

১১) গ্রিটঃ
গ্রিট কবুতর ও ঘুঘুর জন্য অন্যতম একটি খাদ্য উপাদানের মত। যদিও পাখিদের গ্রিট দিয়া হয়। যা কবুতরের গ্রিট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। গ্রিট মূলত কবুতরের খাদ্য ও বীজ হজমে বিশেষ ভুমিকা রাখে। যদিও অনেকেই মনে করেন যে গ্রিট ডিমের খোসা শক্ত করে ক্যালসিয়াম এর অভাব পুরণ করে ইত্যাদি। কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ভুল। গ্রিট ক্যালসিয়াম এর কিছুটা অভাব পুরণ করে, ঝিনুক শেল,সমুদ্রের ফেনা ইত্যাদির কারনে, কিন্তু এর উদ্দেশ্য এটা না। গ্রিট এর ব্যাপারে একটা বিষয় খুবই খেয়াল রাখতে হবে যে, তৈরি গ্রিট যেখান থেকেই কিনুন না কেন, খেয়াল রাখবেন যেন শামুকের শেল না থাকে। এটা কবুতরের অনেক ক্ষতি করে থাকে। অনেকের ধারণা বাজারে যে গ্রিট কিনতে পাওয়া যায় তা ভাল না। অথচ যারা নতুন কবুতর পালে তাদের প্রথম এই গ্রিট দিয়েই শুরু করে। অনেকেই ব্যাবসায়িক চিন্তা থেকে বলে থাকেন যে বাইরের গ্রিট দিবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমি বলি বাইরের গ্রিট যদি আপনি গরম করে আপনার কবুতর কে সরবরাহ করেন তাহলে আপনার ভয়ের কোনই কারণ নাই। তবে আপনি নিজে গ্রিট তৈরি করতে পারলে ভাল। গ্রিট তৈরির পদ্ধতি নিয়ে একটা পোস্ট আছে। অনুগ্রহ করে দেখে নিবেন।

১২) কবুতরের রোগ ব্যাধিঃ
কবুতরের যত ধরনের রোগ আছে সেগুলো নিয়ে অনেক পোস্ট দেয়া হয়েছে। যা গ্রুপ এর ফাইল মেনুতে সংরক্ষণ করা আছে। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন, আপনি যদি সাল্মনেল্লা (salmonella) ক্রিমি ও কবুতরের শরীরের মাইট কে নিয়ন্ত্রন করতে পারেন তাহলে কবুতর পালন নিয়ে আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না। মনে রাখবেন যে, কবুতরের রোগে না মরে তার থেকে বেশি মরে উল্টাপাল্টা ঔষধ ও রোগ নির্ণয়ের অভাবে। অধিক পরিমানে ও মাত্রার অ্যান্টিবায়টিক এর ব্যাবহারের ফলে, তাই এগুলোর ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকবেন।

১৩) ব্রিডিং পেয়ার তৈরিঃ
একটা ব্রিডিং জোড়া তৈরি করাটা খুবই কঠিন একটা ব্যাপার। মানে আপনি যদি ভাল ডিম বাচ্চা করতে চান তাহলে আপনাকে অল্প বয়স থেকে তাকে তৈরি করতে হবে। যদিও অনেকেই পূর্ণ বয়স্ক কবুতর কিনতেই বেশি পছন্দ করে থাকেন। কিন্তু আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যে আপনি পূর্ণ বয়স্ক কবুতর কিনতে গিয়ে বুড়ো কবুতর আবার না কিনে ফেলেন । এই জন্য নতুন পূর্ণ বয়স্ক কবুতর কিনতে পারেন। তবে জিরো পরের কবুতর কিনলে আপনি তাকে আপনার পরিবেশ ও খাবারের সাথে খাপ খাওয়াতে বেশি সুবিধা হবে । একটা ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন যেন ব্রিডিং জোড়া কে পারত পক্ষে অ্যান্টিবায়টিক না দেয়া হয়, আর যদিও দিতে হয় মধ্যম বা নিন্ম লেভেল এর অ্যান্টিবায়টিক দিবেন। তা না হলে তার ডিম পাড়ার ক্ষমতা কমে যাবে।

 

লেখাঃ কে এফ সোহেল রাব্বি ( কবুতর এক্সপার্ট)

Leave a Reply

Scroll To Top